রক্তের দাগ

নন্দ এক মুখ হাসিয়া বলিল‌, ‘সেইজনেই তো কাজটা আমি হাতে নিয়েছি স্যার। দু-চার ঘা দিয়ে কেটে পড়ব। আমি এ-পাড়ার ছেলে নই‌, চিনতে পারলেও সনাক্ত করতে পারবে না।’

ব্যোমকেশ হাসিয়া গাত্ৰোত্থান করিল‌, ‘তবু্‌, যদি কোনও গণ্ডগোল বাধে আমাকে খবর দিও। আজ তাহলে উঠি। নমস্কার‌, ভূতেশ্বরবাবু।’

বড় রাস্তায় আমাদের পৌঁছাইয়া দিয়া নন্দ আখড়ায় ফিরিয়া গেল। ব্যোমকেশ নিশ্বাস ছাড়িয়া বলিল‌, ‘বাপ‌, একেবারে বাঘের গুহায় গলা বাড়িয়েছিলাম!’

আমি বলিলাম‌, ‘কিন্তু সত্যকামকে মারধর করার উৎসাহ দেওয়া কি তোমার উচিত? তুমি ওর টাকা নিয়েছ।’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘দু-চার ঘা খেয়ে যদি ওর প্রাণটা বেঁচে যায় সেটা কি ভাল নয়?’

৩

যদিও আমি কোনও দিন অফিস-কাছারি করি নাই‌, তবু কেন জানি না। রবিবার সকালে ঘুম ভাঙিতে বিলম্ব হয়। পূর্বপুরুষেরা চাকুরে ছিলেন‌, রক্তের মধ্যে বোধ হয় দাসত্বের দাগ রহিয়া গিয়াছে।

পরদিনটা রবিবার ছিল‌, বেলা সাড়ে সাতটার সময় চোখ মুছিতে মুছিতে বাহিরের ঘরে আসিয়া দেখি ব্যোমকেশ দুহাতে খবরের কাগজটা খুলিয়া ধরিয়া একদৃষ্টি তাকাইয়া আছে। আমার আগমনে সে চক্ষু ফিরাইল না‌, সংবাদপত্রটাকেই যেন সম্বোধন করিয়া বলিল‌, ‘নিশার স্বপন সম তোর এ বারতা রে দূত!’

তাহার ভাবগতিক ভাল ঠেকিল না‌, জিজ্ঞাসা করিলাম‌, ‘কী হয়েছে?’

সে কাগজ নামাইয়া রাখিয়া বলিল‌, ‘সত্যকাম কাল রাত্রে মারা গেছে।’

‘অ্যাঁ! কিসে মারা গেল?’

‘তা জানি না।–তৈরি হয়ে নাও‌, আধা ঘণ্টার মধ্যে বেরুতে হবে।’

আমি কাগজখানা তুলিয়া লইলাম। মধ্য পৃষ্ঠার তলার দিকে পাঁচ লাইনের খবর—

–অদ্য শেষ রাত্রে ধর্মতলার প্রসিদ্ধ সুচিত্রা এম্পেরিয়মের মালিক সত্যকাম দাসের সন্দেহজনক অবস্থায় মৃত্যু ঘটিয়াছে। পুলিস তদন্তের ভার লইয়াছে।

সত্যকাম তবে ঠিকই বুঝিয়াছিল‌, মৃত্যুর পূবাভাস পাইয়াছিল। কিন্তু এত শীঘ্র! প্রথমেই স্মরণ হইল‌, কাল সন্ধ্যার সময় নন্দ ঘোষ চাদরের মধ্যে খেটে লুকাইয়া বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করিতেছিল–

বেলা সাড়ে আটটার সময় ব্যোমকেশ ও আমি আমহার্স্ট স্ট্রীটে উপস্থিত হইলাম। ফটকের বাহিরে ফুটপাথের উপর একজন কনস্টেবল দাঁড়াইয়া আছে; একটু খুঁতখুঁত করিয়া আমাদের ভিতরে যাইবার অনুমতি দিল।

ইট-বাঁধানো রাস্তা দিয়া সদরে উপস্থিত হইলাম। সদর দরজা খোলা রহিয়াছে‌, কিন্তু সেখানে কেহ নাই। বাড়ির ভিতর হইতে কান্নাকাটির আওয়াজও পাওয়া যাইতেছে না। ব্যোমকেশ দরজার সম্মুখে পৌঁছিয়া থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল‌, নীরবে মাটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল। দেখিলাম দরজার ঠিক সামনে ইট-বাঁধানো রাস্তা যেখানে শেষ হইয়াছে সেখানে খানিকটা রক্তের দাগ। কাঁচা রক্ত নয়‌, বিঘাতপ্রমাণ স্থানের রক্ত শুকাইয়া চাপড়া বাঁধিয়া গিয়াছে।

আমরা একবার দৃষ্টি বিনিময় করিলাম; ব্যোমকেশ ঘাড় নাড়িল। তারপর আমরা রক্ত-লিপ্ত স্থানটাকে পাশ কাটাইয়া ভিতরে প্রবেশ করিলাম।

একটি চওড়া বারান্দা‌, তাহার দুই পাশে দুইটি দরজা। একটি দরজায় তালা লাগানো‌, অন্যটি খোলা; খোলা দরজা দিয়া মাঝারি। আয়তনের অফিস-ঘর দেখা যাইতেছে। ঘরের মাঝখানে একটি বড় টেবিল‌, টেবিলের সম্মুখে ঊষাপতিবাবু একাকী বসিয়া আছেন।

ঊষাপতিবাবু টেবিলের উপর দুই কনুই রাখিয়া দুই করতলের মধ্যে চিবুক আবদ্ধ করিয়া বসিয়া মুম্ন আমরা প্রবেশ করলে দুখািভরা চোখ তুলিয়া চাহিলন‌, শুষ্ক নিষ্প্রাণ স্বরে বললেন, ‘কী চাই?’

ব্যোমকেশ টেবিলের পাশে গিয়া দাঁড়াইল‌, সহানুভূতিপূর্ণ স্বরে বলিল‌, ‘এ-সময় আপনাকে বিরক্ত করতে এলাম‌, মাফ করবেন। আমার নাম ব্যোমকেশ বক্সী—’

ঊষাপতিবাবু ঈষৎ সজাগ হইয়া পর্যায়ক্রমে আমাদের দিকে চোখ ফিরাইলেন‌, তারপর বলিলেন‌, ‘আপনাদের আগে কোথায় দেখেছি। বোধহয় সুচিত্রায়।–কী নাম বললেন?’

‘ব্যোমকেশ বক্সী। ইনি অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়।–কাল আমরা আপনার দোকানে গিয়েছিলাম—’

ঊষাপতিবাবু আমাদের নাম পূর্বে শুনিয়াছেন বলিয়া মনে হইল না‌, কিন্তু খদ্দেরের প্রতি দোকানদারের স্বাভাবিক শিষ্টতা বোধ হয় তাঁহার অস্থিমজ্জাগত‌, তাই কোনও প্রকার অধীরতা প্রকাশ না করিয়া বলিলেন‌, ‘কিছু দরকার আছে কি? আমি আজ একটু–বাড়িতে একটা দুর্ঘটনা হয়ে গেছে—’

ব্যোমকেশ বলিল‌, ‘জানি। সেই জন্যেই এসেছি। সত্যকামবাবু–’

‘আপনি সত্যকামকে চিনতেন?’

‘মাত্র পরশু দিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি আমার কাছে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন–’

‘কী প্রস্তাব?’

‘তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে‌, হঠাৎ যদি তাঁর মৃত্যু হয় তাহলে আমি তাঁর মৃত্যু সম্বন্ধে অনুসন্ধান করব।’

ঊষাপতিবাবু এবার খাড়া হইয়া বসিলেন‌, কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চক্ষে চাহিয়া থাকিয়া যেন প্রবল হৃদয়াবেগ দমন করিয়া লইলেন‌, তারপর সংযত স্বরে বলিলেন‌, ‘আপনারা বসুন। —সত্যকাম তাহলে বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু মাফ করবেন‌, আপনার কাছে সত্যকাম কেন গিয়েছিল বুঝতে পারছি না। আপনি—আপনার পরিচয়-মানে আপনি কি পুলিসের লোক? কিন্তু পুলিস তো কাল রাত্রেই এসেছিল‌, তারা—’

‘না‌, আমি পুলিসের লোক নই। আমি সত্যান্বেষী। বেসরকারী ডিটেকটিভ বলতে পারেন।’

‘ও—’ ঊষাপতিবাবু অনেকক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন‌, তারপর বলিলেন‌, ‘সত্যকাম কাকে সন্দেহ করে‌, আপনাকে বলেছিল কি?’

‘না, কারুর নাম করেননি।–এখন আপনি যদি অনুমতি করেন। আমি অনুসন্ধান করতে পারি।‘

0 Shares